সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

কাগজের নৌকো- প্রত্যুষ প্রভ কিস্কু



নূপুর চোখের জল মুছতে মুছতে ছুটে আসে -তার নিস্তব্ধতার সর্বশ্রেষ্ঠ আস্তানায় |

অনেকটা পথ এসেছে সে - পিছনে ফিরে তাকায়নি একবারেও!

পায়ের একটা তোড়া নরম ঘাসের আদলে কোথায় যেন ছিঁড়ে গেছে!

ভালো করে দেখে নেয়-

"ইসস অনেকটাই কেটেছে!"-

হাত বুলিয়ে নেয় আলতো করে, ডান হাতের আঙ্গুল দিয়ে |

অন্য হাতে "কাগজের নৌকো" |

উঠে দাঁড়িয়ে দেখে নেয় ভালোকরে চারিদিকটা -

শুধু নির্জনতা!-আর নদীর জলটা ঝিকমিক করছে- মৃদুমন্দ বাতাসে,

গাছের পাতাগুলো দোলতে দোলতে লুকোচুরি খেলছে -মেঘের বুক চিরে আসা রোদের রোশনার সাথে!


চোখ বন্ধ করে সে- বুক ভরে নেয় একটা দীর্ঘশ্বাস!

উপভোগ করে এই নির্জনতা -

তার এই বারো বৎসর বয়সেই অগুন্তি  তিক্ত অভিজ্ঞতা!


মনের দেয়ালে অনুরণিত হয় শুধুই বাবার নেশাতুর গর্জন আর -মায়ের চিৎকার করে ভাঙা ঘরের মেঝেতে লুটিয়ে পড়ার শব্দ আর অবচেতন দেহ টা!

আর ভাবতে পারেনা সে! চোখের পর্দা গরম হয়ে আসে!

তার মনের ছোট্ট প্রজাপতির- পাখা গুলো কে যেন আস্তে আস্তে ছিঁড়ে ফেলছে!-

পিষে দিচ্ছে তার প্রিয় সব থেকে প্রিয় -'ঝুমঝুমি' নামে পুতুলটার মাথাটা মাটির সঙ্গে!


হৃদপিন্ডটা পাঁজরার খাঁচাতে ধড়াস ধড়াস করতে করতে হঠাৎ যেন দরজা খুলে বেরিয়ে আসতে চায়!

স্নায়ু গুলো ঢিলে হয়ে আসে |

চোখ খুলে দেখতে থাকে তার হাতে বানানো ছোট্ট 'নৌকোটাকে'|


আরেকটা দমকা হাওয়া জানিয়ে দিয়ে গেলো সময় হয়েছে!

উঠে দাঁড়িয়ে খোঁড়াতে খোঁড়াতে নেমে আসে সে নদীর তীর বেয়ে-


প্রকৃতি যেমন কিছুই জানেনা!

জানেনা নুপুরের কথা - যে নুপুরের ছন্দে মেতে থাকতো একটা সুন্দর প্রাণবন্ত সংসার!

সেই ছন্দ আজ যেন তাল হারিয়ে একটা অপ্রাকৃতিস্থ কুঁয়োয় বিসর্জন দিয়েছে নিজের প্রাণ ভ্রমরাকে!-

শুধু পরিত্যক্ত খোলসটা পড়ে আছে বেহায়ার মতো!


ফুঁপিয়ে ওঠে নূপুর!-কিন্তু পরক্ষনেই সামলে নেই নিজেকে |

হাতে বানানো নৌকোটাকে ভাসিয়ে দেয় স্রোতের অনুকূলে |

অস্বাভাবিক অস্থিরতা আর অসামঞ্জ্যস্যকর বদমেজাজি তরঙ্গ গুলো যেন জীবনের নিষ্ঠুরতাকে নির্লজ্জভাবে প্রকাশ করেই চলেছে - প্রতিটি ঝাপটাতে!

এদিক-ওদিক দুলতে দুলতে একদিন হয়তোএই তরঙ্গেই মিশে যাবে কাগজের অস্তিত্ব !

এক সমসত্ত্ব মিশ্রনে পরিণত হবে প্রবাহ মান  এই অভিলাসী জলধারায়!-

নিস্পলক দৃষ্টিতে দেখতে থাকে নূপুর- ঢেউ গুলোর এই বেলেল্লাপনা |

হঠাৎ! মুখ ফ্যাকাসে হয়ে আসে তার|

ভাসতে ভাসতে নৌকোটা কোথায় যেন স্থির!

আর এগোচ্ছে না, হয়তো বা জড়িয়ে গেছে আগাছার জালে!

তার দৃষ্টি চঞ্চল হয়ে ওঠে রোজকার মন খারাপের মত আজও সে এসেছিলো একটা চাপা আর্তনাদ বুকে নিয়ে মূক হয়ে!

একেই ঘাটে!

আশা এই যদি তার মন খারাপের মেঘ একটু খানি সরে |

প্রায়ই দেখতো - নৌকোটি জল তরঙ্গে হারিয়ে যেতে চোখের সামনে -

কিন্তু আজ তার ব্যতিক্রম কেন!,

কিছু দূর যেতেই চিৎকার গুলোর হাতছানি দেয় নুপুরের অবচেতনে -

কিছুদূর যেতেই পথ ঘুরিয়েছে নৌকার মুখ খানি যেন কে!-


ওই তো! কেউ কি ওখানে!

আগাছার মধ্যে থেকে তুলে নিয়েছে তার বানানো 'কাগজের নৌকোটাকে'-

নুপুরের নৌকো তো কখনো এরকম করে না!

নুপুরের দৃষ্টি আবক্ষ, নিস্পলক, স্থির - নাড়ীর স্পন্দন কি স্থির!-

না হৃদস্পন্দন চঞ্চল?

দূরে-দূরে ওই মানুষটার দিকে |.....


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

লেদ মেশিন- মনোজ কুমার সরকার

বহুদিন আগের কথা। আমি তখন অবিভক্ত বিহারের একটি অঞ্চলে কারখানার সুপারভাইজার।বেশিরভাগকর্মচারী অবাঙালী হলেও তাদের মধ্যে জনা পাঁচেক বাঙালীও ছিল। এদের মধ্যে আবার প্রিয়তোষ ছিল ম্যানেজার। ঐ যা হয়, ধীরে ধীরে আমাদের মধ্যে একটা বন্ধুত্ব গড়ে উঠলো। তাছাড়া ও ছিল আমার মতই গ্রাজুয়েট। সত্যি কথা বলতে কি সারাজীবনে প্রিয়র মত বন্ধু আর কখনো পাইনি। আমি শুরুতেই মধুপুরের কাছে ঝিল্লি এলাকায় একটি বাড়ি ভাড়া নিয়েছিলাম। বাড়িওয়ালা সুখান রাম একদিন বলেছিল,"একটা কথা বলি বাঙালি বাবু, কিছু মনে করবেন না, এখানে আপনি একা থাকেন, কোনো বন্ধু জুটিয়ে লিন, বাড়িভাড়া আধা হয়ে যাবে"। আমারও কথাটা মনে ধরল। পরদিন কাজের ফাঁকে চুপিচুপি প্রিয়তোষ কে কথাটা বলতেই ও যেন হাতে চাঁদ পেল। খুবই খুশি হয়ে বলল,"এ তো খুবই ভালো প্রস্তাব, লোভনীয় তাতে সন্দেহ নেই, আমি যেখানে এখন থাকি তাকে ভদ্র পাড়া বলা চলে না,বুঝলে ভায়া কিছু চাষাভুসো খোট্টাদের বাস সেখানে। তারপর রাত্রিবেলা মাতাল হয়ে যা শুরু করে তাতে ঘুম তো দূরের কথা টেকা দায় হয়ে পড়ে"। আমি বাড়ি বদলানোর কথা বলতেই ও বললো,আজকে রবিবার, খুবই ভালো সময়। ওইদিন ছুটি আছে ফ...

বাবা- কোয়েনা দাস

 কষ্টটাকে চেপে রেখে, হাসি ঠোঁটের কোণে  আদরগুলো চাপা থাকে , তাঁর ধমকই সবাই শোনে  মাথার উপর বটগাছ হয়ে দেয় আমাদের ছায়া  কঠোর মুখের গভীরেও তাঁর হাসিতে বড় মায়া | চাওয়া - পাওয়ার সব আবদার তাঁর কাছে দেয় ধরা  ছেলেবেলায় রোজ শোনাতেন ঘুম-পাড়ানি ছড়া , মেয়ে একদিন বড় হবে , যাবে শশুরবাড়ি  শতকষ্টেও বিদায় সে দেয় , মুখ করেনা হাঁড়ি  কাজের চাপে মাঝে মাঝে সময় ও পায় না  বাড়ির কথা মনে পড়ে , তবু কথা হয়না | সকাল বেলা বেরিয়ে সে যায় , কাজ থেকে ফেরে রাতে  তবু কন্যার আবদার সবই থাকে তাহার হাতে , মেয়ের ভালো রেজাল্ট হলে যার গর্বে ভরে বুক  মাঝে মাঝেই ঝিলিক দেয় উজ্জ্বল ওই মুখ  নিজের জন্য জিনিস কিনতে তাঁর ভীষণ অনীহা  সেই টাকাতে কিনবে মেয়ের বিয়ের জড়োয়া | কঠোর খোসার ভিতরে লোকানো নরম একটা মন  লক্ষ্য শুধু একটাই তাঁর - আমাদের আশাপূরণ , ক্লান্ত শরীর , টলমলে পা , তবু করতেই হবে রোজগার  টাকা ছাড়া চলবেনা দিন , তাঁর কাঁধেই গোটা সংসার  পারিপার্শ্বিক চাপেই বোধহয় তাঁর বাইরেটা হয় শক্ত  সবার মুখে হাসি ফোটাতে জল হয়ে যায় রক্ত | কাজের ফাঁকে যে মানুষটা একটু সময় প...

উদ্বিগ্ন-পাপড়ি সেনগুপ্ত

ভাল্লাগেনা এই একঘেয়ে জীবন থাকো ঘরে নইলে মরণ। যেও না তুমি কারো বাড়ি , হয়েছে যেন সবার আড়ি। ঘরে বসেই দিন কাটাও যা কিছু শখ ঘরেই মেটাও। এভাবে কি আর জীবন চলে , পিষছে মানুষ জাঁতা কলে। ফোনেই সব কাজ সারো , সামনে তুমি যেও না কারো। কিভাবে যে কাটছে দিন , অবস্থা বড়ই সঙ্গীন ! অসুখ বিসুখ ঘরে ঘরে , বাঁচবে মানুষ কেমন করে ? চারি দিকে শুধু জ্বর জারি প্রাণ কাড়ছে মহামারী ! কেবল দুশ্চিন্তায় দিন কাটে , শখ সাধ সব উঠল লাটে। কেউ না খেতে পেয়ে দিন কাটায় আর বাঁচার কোনো নেই উপায়। কত প্রিয় জনের যাচ্ছে প্রাণ পথ দেখাও তুমি হে ভগবান। ভাবলে বড়ই হতাশ লাগে ! ছিলাম বেশ দিব্যি আগে।